চলছে না হারভেস্টার, বিপাকে কৃষক
জ্বালানি সংকটে অচল কৃষিযন্ত্র
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২২-০৪-২০২৬ ০৩:০০:১৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২২-০৪-২০২৬ ০৩:২৬:০৭ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
জ্বালানি তেলের সংকটে দেশের শস্যভান্ডার খ্যাত সুনামগঞ্জের কৃষকরা ক্ষেতের পাকা ধান কাটা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। একদিকে, বৃষ্টিতে হাওরের জমির মাটি নরম হওয়ায় প্রায় জমিতে চলাচল করতে পারছে না হারভেস্টার (ধান কাটার মেশিন); অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সংকট তাদের ফেলে দিয়েছে দুশ্চিন্তায়। চাষিরা চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপার মেশিনসহ বিভ্ন্নি কৃষি যন্ত্রপাতি চালাতে পারছেন না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়ায় বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত দামে ধান কাটতে হচ্ছে তাদের।
এ সংকটের বিষয়টি কৃষি বিভাগ স্বীকার করেছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সুনামগঞ্জ জেলায় এবার বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে। ইতোমধ্যেই জেলার প্রায় সব হাওরে ধান পাকতে শুরু করেছে। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির ভয়কে সামনে রেখে পাকা ধান ঘরে তুলতে মাঠে নেমেছেন হাওরের কৃষকরা। কিন্তু, ডিজেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী ধান কাটতে পারছেন না হারভেস্টার মালিকরা।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরের হারভেস্টার মালিক লিলু মিয়া জানান, দিনে-রাতে ধান কাটতে গিয়ে যে পরিমাণ তেলের প্রয়োজন, সেই পরিমাণ তেল তারা পাচ্ছেন না। প্রশাসনের প্রত্যয়ন অনুযায়ী ১০০ লিটার তেল পেতেও নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে। খুচরা বাজারে তেল মিললেও গুণতে হয় বাড়তি টাকা। বৃষ্টিপাতের কারণে নিচু এলাকার জমিতে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। জলমগ্ন জমিতে হারভেস্টার মেশিন চলাচল না করতে পারায় ক্ষতির মুখে কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার সহস্রাধিক কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপার মেশিন রয়েছে। একেকটি কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিন-রাতে ৬০-৭০ বিঘা জমির ফসল কাটতে পারে। এতে প্রতিদিন প্রতি হারভেস্টার মেশিনের জন্য ১২০-১৫০ লিটার জ্বালানি তেল প্রয়োজন। জেলার হাওরগুলোতে ধান কাটা শুরু হয়ে গেলেও জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
জেলার বিভিন্ন হাওরে সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পাকা ও আধাপাকা অবস্থায় রয়েছে বেশির ভাগ জমি। হাওরে রয়েছে শ্রমিক সংকট। কৃষকরা জানান, বৈশাখে বহুকাল ধরে সনাতন পদ্ধতিতে ধান কাটতেন তারা। তবে হাওরের ধানকাটার মেশিন হারভেস্টারের প্রচলন আসার পর থেকে কৃষকরা ধান কাটার জন্য মেশিননির্ভর হয়ে পড়েছেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়তি থাকায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। তেলের কারণে হাওরে হারভেস্টারের সংখ্যা কম। ধান কাটতে একজন কৃষককে ৫-৭ দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তা ছাড়া, ধান কাটাতে কৃষকদের গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। যেখানে গত বছর বিঘাপ্রতি খরচ ১৭০০-১৮০০ টাকা ছিল; সেখানে অতিরিক্ত ৫০০-৭০০ টাকা বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে কৃষকদের।
শান্তিগঞ্জের আস্তমা গ্রামের কৃষক খালিক দেওয়ান বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ানোর কারণে মেশিনের মালিকরা ধান কাটার খরচ বৃদ্ধি করেছে। কেয়ার প্রতি ২৫০০ টাকা দিয়েও হারভেস্টার পাওয়া যাচ্ছে না। ধান কাটতে আগে তালিকায় নাম উঠাতে হয়।’
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিঘাপ্রতি ১৯০০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও তেল সংকটের অজুহাতে ২৩০০-২৫০০ টাকা দরে ধান কাটতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে চাষাবাদ ব্যয় বাড়ায় হতাশ কৃষকরা। ধানের মূল্য কম থাকায় মুনাফা হবে না বলে জানান তারা। তাই ধান কাটার মৌসুমে তেলের দাম সহনশীল রাখার দাবি চাষিদের।
সেলিম মিয়া নামের এক কৃষক বলেন, ‘ধান আর কয় মণই পাই। বেশি হলে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ১৮ মণ। বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ যাচ্ছে ১০ হাজার টাকা। সারাবছরের শ্রম তো আছেই। ধানের মূল্য অনেক কম। এভাবে চলতে থাকলে কৃষিতে লাভবান হওয়া যাবে না।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘জেলার বেশির ভাগ হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। হারভেস্টারের জ্বালানি তেলের সংকট নেই জানিয়ে তেল সরবরাহে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
হারভেস্টার মালিকদের মেশিনপ্রতি দিনে ১০০ লিটার তেল প্রদান করতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনকে প্রত্যয়ন দিতে বলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেল পেতে সমস্যা হলে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নেবো।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স